দিনাজপুরে শ্রমিক নেতার মুক্তির দাবিতে থানা ঘেরাও, সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ

শ্রমিক নেতার মুক্তির দাবিতে থানার প্রধান ফটকের সামনে বাস আড়াআড়িভাবে রেখে সড়ক অবরোধ। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় কোতোয়ালি থানার সামনেছবি: প্রথম আলো

দিনাজপুরে মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা শেখ বাদশার মুক্তির দাবিতে কোতোয়ালি থানা ঘেরাও ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন পরিবহন শ্রমিকেরা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাতটা থেকে জেলা শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আড়াআড়িভাবে রেখে তাঁরা অবরোধ করেন। এ ঘটনায় শহরের সঙ্গে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে যান বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। এক পক্ষের শ্রমিকেরা গ্রেপ্তার শেখ বাদশার পক্ষে বিক্ষোভ করছেন। অন্য পক্ষে আছেন আরেক শ্রমিক নেতা মো. হিরুর অনুসারীরা। হিরুর পক্ষে স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদেরও দেখা যায়। দুপুর ১২টার দিকে থানার প্রধান ফটকের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।

দুপুর সাড়ে ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থেমে থেমে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা চলছে। বর্তমানে থানার ভেতরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ফরহাদ হোসেনসহ (প্লাবন) কয়েকজন নেতা-কর্মী অবস্থান করছেন। অন্যদিকে থানার প্রধান ফটকের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়েছেন শেখ বাদশার অনুসারীরা।

দিনাজপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আবদুল হালিম দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সিনিয়র শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। আলোচনা চলমান আছে।’

গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দিনাজপুর শহরের মহারাজা বটতলী (রাজারহাট) এলাকা থেকে জেলা মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ বাদশাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় করা একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শ্রমিক নেতার মুক্তির দাবিতে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ। বৃহস্পতিবার সকালে কোতোয়ালি থানা চত্বরে
ছবি: প্রথম আলো

শেখ বাদশা জেলা শ্রমিক লীগের সাবেক নেতা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবাদ সম্মেলন করে তিনি শ্রমিক লীগের পদ ছাড়েন। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচনে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহের নির্ধারিত সময়। এর মধ্যেই গতকাল রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাদশার অনুসারী শ্রমিকদের অভিযোগ, ১৯ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হতে যাচ্ছেন শেখ বাদশা। তাঁকে নির্বাচন থেকে সরাতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর সহযোগিতায় পুলিশকে চাপ দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করিয়েছে।

আজ সকালে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড়, মহারাজা মোড়, ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড ও বালুয়াডাঙ্গা মোড় ঘুরে দেখা যায়, শহরের প্রধান চারটি প্রবেশপথে বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আড়াআড়িভাবে রেখে অবরোধ করা হয়েছে। শহরের আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়েছেন। কোতোয়ালি থানার প্রধান ফটকের সামনেও কয়েকটি বাস দাঁড় করিয়ে প্রবেশপথে বাধা তৈরি করা হয়েছে। থানা চত্বরসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত কয়েক শ শ্রমিক অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন।

শ্রমিকদের সঙ্গে থানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন বাদশার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়টি গ্রেপ্তারের পর জানতে পারেন। গতকাল রাতে থানায় গেলে স্বামীর প্রতিপক্ষ ও বিএনপির কয়েকজন কর্মী তাঁকে (বাদশা) লাঞ্ছিত করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শেখ বাদশা শ্রমিক লীগের নেতা। তাঁর নামে মামলা থাকায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু কতিপয় শ্রমিক থানা আক্রমণ করে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে একধরনের মব সৃষ্টি করেছে। সড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি করছে। তাঁরা যেহেতু সরকারি দলের সঙ্গে আছেন, স্বাভাবিকভাবে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য তাঁরা ১০ জনের মতো আসেন। তখন শেখ বাদশার লোকজন তাঁদের ওপর হামলা করেন।

শ্রমিকদের দুই পক্ষের পাল্টপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে আহত একজনকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে থানার প্রধান ফটকের সামনের সড়কে
ছবি: প্রথম আলো

দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শেখ বাদশা নামে থানায় মামলা আছে। এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা মুক্তির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন। এ নিয়ে পুলিশ তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে।

শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত

এদিকে চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সহকারী নির্বাচন কমিশনার গোলাম নবী (দুলাল) প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব নয়। আজ দুপুরে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আলোচনা করে নির্বাচন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।