বালিয়াডাঙ্গীতে স্কুল ফিডিংয়ের দুধ–বানরুটি খাওয়ার পর হাসপাতালে ৩১ শিক্ষার্থী
দুধ–বানরুটি খাওয়ার খানিক পরই শুরু হয় বমি, সঙ্গে পেটব্যথা। একে একে অসুস্থ হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। প্রথমে বিদ্যালয়েই তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছুটতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ৩১ শিক্ষার্থীকে। তাদের মধ্যে ২৯ জন এখনো হাসপাতালে ভর্তি।
আজ সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মধুপুর–১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মধ্য গোয়ালকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। দুই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় দেওয়া প্যাকেটজাত দুধ পান ও বানরুটি খেয়েছিল। দুধ খাওয়ার পরই তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা বলছেন, হাসপাতালে আসা শিক্ষার্থীদের অনেকের বমি ও পেটের পীড়ার উপসর্গ ছিল। বর্তমানে ভর্তি থাকা ২৯ শিক্ষার্থীর অবস্থা স্থিতিশীল। প্রাথমিকভাবে খাদ্যে বিষক্রিয়ার আশঙ্কার কথা ধারণা করা হলেও পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা যাচ্ছে না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চলছে। কর্মসূচির আওতায় প্রতি সোমবার শিক্ষার্থীদের বানরুটির সঙ্গে ২০০ মিলিলিটার ইউএইচটি দুধ দেওয়া হয়। ইউএইচটি বা আলট্রা হাই টেম্পারেচার পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা এই দুধ প্যাকেট খোলার পর সরাসরি পান করা যায়।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায় বলেন, মিড ডে মিল প্রকল্পের আওতায় রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইউএইচটি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা প্যাকেটজাত দুধ সরবরাহ করে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে মধুপুর–১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুধ ও বানরুটি খায়। এরপর কয়েকজন শিক্ষার্থী বমি ও পেটব্যথার কথা জানায়। বিদ্যালয়েই প্রথমে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাদের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ওই বিদ্যালয়ের মোট ২৮ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর মধ্য গোয়ালকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের একজনকে চিকিৎসার পর বাড়ি পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন সেখানে ২৯ শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার তুষার চন্দ্র সিংহ বলেন, বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩১ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই বমি করছিল এবং অনেকে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত ছিল।
হাসপাতালে ভর্তি ২৯ শিক্ষার্থীর অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. আহাদুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে থাকতে পারে। তবে পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়।
দুধ সরবরাহকারী রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেডের প্রকল্প সমন্বয়কারী জাকারিয়া আমান বলেন, তাঁদের সরবরাহ করা দুধের মান নিয়ে এর আগে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, কেউ খালি পেটে দুধ পান করলে বমি বমি ভাব হতে পারে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী খালি পেটে দুধ খেয়ে বমি করেছে। আর তা দেখে অন্য শিক্ষার্থীরাও অস্বস্তি বোধ করেছে।
দুধের স্বাদ তিতা লাগছিল
মধুপুর–১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সে বলে, দুধ খাওয়ার পর তার বমি ও পেটব্যথা শুরু হয়। তানিয়ার ভাষ্য, প্যাকেটের দুধের স্বাদ কেমন যেন তিতা তিতা লাগছিল। স্যার ও ম্যামকে বললে তাঁরা খেয়ে নিতে বলেন।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহিল সাফি বলেন, ‘আমি দিনাজপুর যাচ্ছিলাম। শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছি। সরবরাহ করা দুধের প্যাকেটের দুধ বাইরে থেকে দেখে নষ্ট কি না, তা বোঝার উপায় ছিল না।’
এদিকে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা হাসপাতালে যান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার দাস, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অতুল চন্দ্র রায় ও বালিয়াডাঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বুলবুল ইসলাম হাসপাতালে গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন।
ঘটনার পর সরবরাহ করা দুধ ও খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান ইউএনও অঞ্জন কুমার দাস। তিনি বলেন, সরবরাহ করা দুধ ও খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।