ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ৩০
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার জেরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার পর রাত আড়াইটা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তাঁরা পুলিশ সদস্যদের বিচার, কনসার্ট বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানান। পরে উভয় পক্ষকে নিয়ে সভা করে পরিস্থিতি শান্ত করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।
সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোর পর্যন্ত আলোচনা চলে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আমরা দোষীদের চিহ্নিত করব। ফুটেজে সবটাই দেখা যাবে। সভায় উন্মুক্ত কোনো কনসার্ট করা যাবে না বলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি আসে। উত্তরে পুলিশ বলেছে, “আমার কর্ম আমি করব, অন্য কেউ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।” এরপর উভয় পক্ষ শান্ত হয়েছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী সমাবেশ ও শোভাযাত্রা উপলক্ষে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। এ উপলক্ষে গতকাল রাতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা পুলিশ। অনুষ্ঠানে ডিআইজি ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ওবায়দুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলামসহ পুলিশের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ডিআইজি ও পুলিশ সুপার অনুষ্ঠান থেকে চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পুলিশ লাইনসের পশ্চিম পাশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার অবস্থান। অনুষ্ঠান চলাকালে উচ্চ স্বরে গানবাজনার অভিযোগ তুলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে বাধা দেন। এতে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের কথা–কাটাকাটি হয়।
পরে মাদ্রাসার শতাধিক শিক্ষার্থী পুলিশ লাইনসে ঢুকে অনুষ্ঠানস্থলের চেয়ার ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটা শুরু করলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জবাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে পুলিশের সাত সদস্যসহ উভয় পক্ষের ৩০ জন আহত হন। আহত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনার পর পুলিশ লাইনসের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এতে পুলিশ লাইনসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিল্পীরা আটকা পড়েন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আরেকটি দল শহরের পুরাতন জেলা রোড, কুমারশীল মোড় ও হাসপাতাল সড়কে রাত দুইটার দিকে বিক্ষোভ করেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাঁরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে বিভিন্ন দাবি জানান।
ঘটনার পরপরই রাতেই দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যান জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম। তিনি পুলিশ ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে সভা করেন। সভায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ, দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ মাদ্রাসার শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব সাজিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাত্রদের দাবি ছিল, এখানে কনসার্ট করা যাবে না, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ বরখাস্ত এবং আহত ছাত্রদের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া। পুলিশ আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, দায়িত্বে থাকা পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হবে।’
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ‘আমি রাতে চলে এসেছি। ঘটনা শুনেছি। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এসপিসহ অন্যরা বিষয়টি নিয়ে রাতভর ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা কথা বলবেন।’
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করলেও না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে আজ বুধবার দুপুরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইজি ও এসপি স্যার পুলিশ লাইনস থেকে চলে যান। রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান ফটকের পকেট গেট দিয়ে ৩০-৪০ জন মাদ্রাসাছাত্র ঢুকে পড়েন। তাঁরা ভেতরের ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড দিয়ে চেয়ার ভাঙচুর করেন। সদর থানার ওসিসহ আমি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি।’