জাহাজভাঙা শিল্পে ১২ বছরে ১৫০ শ্রমিক নিহত, কেমন আছে পরিবারগুলো

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল নামের জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে আহত এক ব্যক্তিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেনফাইল ছবি : প্রথম আলো

আগে সংসারের খরচ নিয়ে ভাবতে হতো না রেশমা আক্তারকে। জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করে সংসার চালাতেন বাবা মোহাম্মদ মুনছুর। গত ১৪ আগস্ট সেই বাবাকে হারিয়েছেন ২১ বছরের রেশমা। এখন সংসারে উপার্জন করার কেউ নেই। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা রেশমারও চাকরি নেই। কীভাবে সংসার চলবে, সেই দুশ্চিন্তায় কাটছে তাঁর দিন।

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মৌলভীপাড়ায় তাঁদের বাড়ি। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে মারা যাওয়া ১০ শ্রমিকের একজন মুনছুর (৫৫)। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কারখানায় ছুটে গিয়েছিলেন রেশমারা। কিন্তু বাবাকে আর দেখতে পাননি। ততক্ষণে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। ওই রাতেই বাবাকে দাফন করেন তাঁরা।

শ্রমিকের নিরাপত্তায় আইন থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ নেই। প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না হওয়ায় দুর্ঘটনা থামছে না।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত

ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া ১০ লাখ টাকা সঞ্চয় করে রেখেছে পরিবারটি। সেখান থেকে মাসে কিছু টাকা পাওয়ার আশা করছেন। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলবে কি না, সেই চিন্তা রেশমার। তাঁর আক্ষেপ, বাপ তো চলে গেছে!

শুধু রেশমার পরিবার নয়, এক দশকের বেশি সময়ে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়েছে শতাধিক পরিবার। অনেকে গুরুতর আহত হয়ে পড়েছেন জীবিকার সংকটে। সরকারি পরিদর্শন, দুর্ঘটনার নথি ও গবেষণায় বারবার নিরাপত্তার ঘাটতি উঠে এসেছে। তবু ঝুঁকি নিয়েই জাহাজ ভাঙছেন শ্রমিকেরা।

জানতে চাইলে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিকের নিরাপত্তায় আইন থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ নেই। প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না হওয়ায় দুর্ঘটনা থামছে না।

আরও পড়ুন

বিপর্যস্ত আরেক পরিবার

ফেরদৌস স্টিলের একই দুর্ঘটনায় মারা যান সহকারী শ্রমিক সানি দাস (২০)। তাঁর বড় ভাই লিটন দাস (২৫) একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ভাইয়ের শেষকৃত্য ও আনুষঙ্গিক কাজে নিয়মিত কর্মস্থলে যেতে না পারায় চাকরি হারান। আগে
মাসে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন বেকার।

সানির মৃত্যুর পর সংসার চালাতে আবার পোশাক কারখানায় কাজে ফিরেছেন তাঁদের মা আসরা বালা দাস। মাসে পান প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। লিটনের ভাষ্য, ছেলের মৃত্যুর পর মায়ের শরীরও ভালো যাচ্ছে না। মাসে ওষুধের খরচ এক থেকে দেড় হাজার টাকা।

পরিবারটি ক্ষতিপূরণের ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। বিভিন্ন খরচের পর পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। লিটন বলেন, ‘এখন ঋণের ওপর চলতেছি। আমার চাকরিও নাই। মা আবার গার্মেন্টসে চাকরি শুরু করছে।’

লিটনের ভাষ্য, ছেলের মৃত্যুর পর মায়ের শরীরও ভালো যাচ্ছে না। মাসে ওষুধের খরচ এক থেকে দেড় হাজার টাকা।

 ১২ বছরে ১৫০ শ্রমিকের মৃত্যু

২০১৫ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ বছরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫০ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। শ্রম গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নথি বিশ্লেষণ করে এই হিসাব পাওয়া গেছে।

বিলসের হিসাবে, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮, ২০১৭ সালে ১৯, ২০১৮ সালে ১৩ এবং ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২৩ শ্রমিক মারা যান। এরপর ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ১৩, ২০২২ সালে ৭, ২০২৩ সালে ৭, ২০২৪ সালে ৭ এবং ২০২৫ সালে ৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩ জন এবং আগস্টে ফেরদৌস স্টিলে আরও ১০ জন মারা যান।

ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা দিপু দাস বলেন, ‘তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময়ের ট্রমা এখনো কাটছে না।’

বিভিন্ন কারখানায় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে বছরের পর বছর। ২০১৭ সালে ফেরদৌস স্টিলে উঁচু স্থান থেকে পড়ে মারা যান খলিলুর রহমান। ২০১৮ সালে প্রিমিয়াম ট্রেড করপোরেশনে লোহার পাতের আঘাতে মৃত্যু হয় বোরহান উদ্দিনের। পরের বছর একই কারখানায় বিস্ফোরণ ও আগুনে ৩ জন এবং ম্যাক করপোরেশনে বিষাক্ত গ্যাসে আরও ৩ শ্রমিক মারা যান। ২০২২ সালে এইচএম শিপব্রেকিংয়ে জাহাজ কাটার সময় মারা যান মো. ফারুক। ২০২৪ সালে এস এন করপোরেশনে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ৬ জনের মৃত্যু হয়।

আহত শ্রমিকদের দুর্ভোগও কম নয়। ২০১৯ সালে ম্যাক করপোরেশনে দুর্ঘটনায় শ্রমিক হীরালালের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। একই বছর জনতা স্টিলে ভারী লোহার আঘাতে শ্রমিক মো. নাসিরের পায়ের মাংস ছিঁড়ে যায়। আহত ব্যক্তিদের কতজন সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন কিংবা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা দিপু দাস বলেন, ‘তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময়ের ট্রমা এখনো কাটছে না।’

জাহাজভাঙা শিল্পমালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনার পর নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা তৈরি এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় জাহাজভাঙার কাজে ১০৫ ধরনের সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত হয়। এর মধ্যে লোহা কাটার কাজে ১৭ ধরনের, বিপজ্জনক উপাদান অপসারণে ১৪ ধরনের এবং যন্ত্রপাতি খুলে নেওয়া ও তেলবর্জ্য অপসারণের কাজে ১২ ধরনের করে বিপদ চিহ্নিত হয়েছে।

বিপদের ধরনও পুরোনো

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিলসের নথিভুক্ত ২৮টি দুর্ঘটনার মধ্যে ভারী লোহা ও যন্ত্রপাতির আঘাতের ঘটনা ৯টি। ক্রেন, হুক ও তারের আঘাতের ঘটনা ৮টি এবং গ্যাস ও আগুনের ঘটনা ৫টি। আহত ২৫ জনের মধ্যে ১০ জন গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।  জাহাজভাঙার ঝুঁকি নিয়ে গত ১৮ জুন ওপেন জার্নাল অব সেফটি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা ১৮টি কারখানার ১ হাজার ৭৪ জন শ্রমিক ও তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন।

গবেষণায় জাহাজভাঙার কাজে ১০৫ ধরনের সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত হয়। এর মধ্যে লোহা কাটার কাজে ১৭ ধরনের, বিপজ্জনক উপাদান অপসারণে ১৪ ধরনের এবং যন্ত্রপাতি খুলে নেওয়া ও তেলবর্জ্য অপসারণের কাজে ১২ ধরনের করে বিপদ চিহ্নিত হয়েছে। গবেষকেরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সুরক্ষাসামগ্রী, তদারকি ও দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণের সুপারিশ করেছেন।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মো. মাহবুবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, জটিল এই শিল্প তদারকের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। তবু মাসে দুই থেকে তিনটি কারখানা পরিদর্শন করা হয়। অনিয়ম পেলে নোটিশ ও মামলা করা হয়। ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধেও তিনটি মামলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সবুজ সনদেও নিরাপত্তার প্রশ্ন

শিল্পমালিকদের সংগঠনের হিসাবে, বর্তমানে ২৩টি জাহাজভাঙা কারখানার সবুজ সনদ রয়েছে। ফেরদৌস স্টিলও সনদপ্রাপ্ত। অথচ দুর্ঘটনার ছয় মাস আগে কারখানাটিতে নিরাপত্তার ঘাটতি পেয়েছিল কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর। নোটিশের পর জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা হয়। পরের মাসেই মারা যান ১০ শ্রমিক। শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও গুরুতর গাফিলতি পাওয়া যায়। বিপজ্জনক কাজে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি। ছুটির দিনে কাজ চললেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক, চিকিৎসক ও জরুরি উদ্ধারকারী দল ছিল না। জাহাজের ট্যাংক যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই নিরাপদ ঘোষণার বিষয়টিও উঠে আসে।