সরকারি মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে গরু জবাইয়ের আয়োজন, মাংস ভাগ
আয়োজন করে করা হয়েছে গরু জবাই। মাংস কাটা, ভুঁড়ি পরিষ্কার, ভাগ–বাঁটোয়ারাও করা হয়েছে। সমস্যা হলো, গরু জবাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে হাসপাতাল ভবনের সামনে। এতে হাসপাতালটিতে সেবা নিতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন রোগীরা। ভুক্তভোগীদের কয়েকজন এ নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন।
গত শুক্রবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যার মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে ঘটে এ ঘটনা। আওরঙ্গজেব রোড ও তাজমহল রোডের মাঝামাঝি হাসপাতালটির অবস্থান। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ছয়তলা যে হাসপাতাল ভবন দেখা যায়, সেটির সামনেই এ গরু জবাই করা হয়। কাজ শেষে প্লাস্টিকের নল দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করা হলে পানির সঙ্গে রক্ত ভবনের গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। এ সময় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মুখে কাপড় চেপে তটস্থ ভঙ্গিতে ভবনটিতে ঢুকতে দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর স্বজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্ত্রীর মাসিক–সংক্রান্ত সমস্যায় শুক্রবার সকালে হাসপাতালে যাই। জুমার নামাজের পর গরু জবাই হয়। ভুঁড়ি পরিষ্কার করার সময় গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাংস কাটাসহ অন্যান্য কাজ শেষ করতে ইফতারের সময় হয়ে যায়।’ বিরক্তির সুরে তিনি বলেন, ‘ভাবা যায়, মা ও শিশুদের একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতর কর্মীরা আয়োজন করে গরু জবাই করছেন। সেই রক্ত দেখে সেবা নিতে আসা গর্ভবতী মা ও শিশুদের মনে কী প্রভাব পড়তে পারে, কেউ চিন্তা করেননি।’
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের দিন এখানে যে কর্মীরা বসবাস করেন, তাঁরা গরু কোরবানি দেন। এর বাইরে অন্য সময় হাসপাতালের ভেতরে গরু জবাই করার প্রশ্নই আসে না। ঈদের দিনও হাসপাতাল ভবনের সামনে নয়, পেছনের দিকে গরু জবাই দেন। সেখানেই মাংস ভাগাভাগি করেন। তবে এবার যেভাবে ভবনের সামনে কর্মীরা গরু জবাই করেছেন, তা মা ও শিশুদের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য লজ্জাজনক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে পাথফাইন্ডার প্রকল্পের অধীন মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারটি যাত্রা শুরু করে। পরে ১০০ শয্যার এই মা ও শিশু হাসপাতাল রাজস্ব বাজেটের অন্তর্ভুক্ত হয়। মা ও শিশু হাসপাতাল হিসেবে এটির ২৪ ঘণ্টা সেবাদান কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালে। হাসপাতালটিতে প্রসব–পূর্ব ও প্রসব–পরবর্তী চিকিৎসা, নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসাসেবা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং, বন্ধ্যাকরণসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া হচ্ছে। জরুরি ও প্রসবকালীন সেবা তো আছেই।
গতকাল সোমবার হাসপাতালটিতে গিয়ে গরু জবাইয়ের চিহ্ন চোখে পড়েনি। তবে হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের যে কর্মীরা এখানে থাকেন, তাঁরা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে গরু কিনে জবাই করেছিলেন। এর বাইরে তাঁরা আর কিছু জানেন না।
হাসপাতালটিতে প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসা, নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসাসেবা, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং কাউন্সেলিং, বন্ধ্যাকরণসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া হচ্ছে। জরুরি ও প্রসবকালীন সেবা তো আছেই।
হাসপাতালটিতে গত অক্টোবর মাস থেকে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক ফায়জুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গরু জবাই নিষিদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এখানে যে কর্মীরা বসবাস করেন তাঁরা জানান, আগে প্রতিবছরই নাকি হাসপাতালে গরু জবাই করেছেন তাঁরা। তাই আমি আর এ বিষয়ে আপত্তি করিনি। তবে গরু জবাইয়ের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না। হাসপাতাল ভবনের সামনে গরু জবাই করে থাকলে বিষয়টি ঠিক হয়নি।’
পাঁচ বছর ধরে হাসপাতালটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ বি এম মাজহারুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের দিন এখানে যে কর্মীরা বসবাস করেন, তাঁরা গরু কোরবানি দেন। এর বাইরে অন্য সময় হাসপাতালের ভেতরে গরু জবাই করার প্রশ্নই আসে না। ঈদের দিনও হাসপাতাল ভবনের সামনে নয়, পেছনের দিকে গরু জবাই দেন। সেখানেই মাংস ভাগাভাগি করেন। তবে এবার যেভাবে ভবনের সামনে কর্মীরা গরু জবাই করেছেন, তা মা ও শিশুদের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য লজ্জাজনক।’
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ বলছে, ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর বা অন্য কোনো ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সরকার বা সরকারি গেজেট/প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান ও পারিবারিক চাহিদার ভিত্তিতে পারিবারিক ভোজনের জন্য না হলে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জবাইখানার বাইরে কোনো পশু জবাই করতে পারবে না। এ আইনেই উল্লেখ করা আছে, জবাইখানার বাইরে কোনো স্থানে ও উপায়ে পশু জবাই করতে হলে পানি বা পানির উৎস, বায়ু বা পরিবেশের অন্য কোনো উপাদান যাতে দূষিত না হয় এবং নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী পশু জবাই ও বর্জ্য অপসারণ করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
এ বি এম মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি হাসপাতালের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তা–ও খেয়াল রাখার চেষ্টা করব।’