রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েকজন মালিককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের একজন ইয়াকুব আলীর অভিযোগ, প্রতিদিন একটি গাড়ি থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। এতে রাজি না হওয়ায় ৬০ থেকে ৭০ জন মিলে তাঁকে মারধর করেছে। পরে তাঁকে চাঁদাবাজ সাজিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। মুক্তি পেয়ে হামলার ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি।
আজ শুক্রবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন ইয়াকুব আলী। তিনি বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি। হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবিও জানান তিনি।
ইয়াকুব আলী বলেন, গত ৫ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর লেগুনার চালক গাড়িতে সমস্যার কথা জানালে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রতি গাড়ি থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা দিতে বলেন। এতে আপত্তি জানালে তাঁকেসহ নজরুল ইসলাম ও বাবুল নামের আরও দুজন লেগুনার মালিককে মারধর করেন চাঁদা দাবিকারীরা। একপর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে তাঁদের গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরায় আগ্নেয়াস্ত্র বের করার দৃশ্য দেখা গেছে।
নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে ইয়াকুব আলী বলেন, মারধরের পর তাঁকেই চাঁদাবাজ সাজিয়ে দারুস সালাম থানা–পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। মারধরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু চাঁদাবাজির অভিযোগের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ না পাওয়ায় তিনি মুক্তি পান। এরপর তিনি হামলার ঘটনায় দারুস সালাম থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও গ্রহণ করা হয়নি। পরে তিনি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মারধরের সময় ইয়াকুব আলীকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে স্থানীয়ভাবে তদন্ত করে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। জামিনের পর থানায় অভিযোগ দিতে আসেন। তাঁর অভিযোগের কোনো সুনির্দিষ্ট ভিত্তি নেই বলে অভিযোগ নেওয়া হয়নি।’
পরে জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন ইয়াকুব আলী। সেটা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান ওসি।
বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
লেগুনা মালিক–শ্রমিক ইউনিয়নের অভিযোগ, ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এস এ সিদ্দিক সাজুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত একটি গোষ্ঠী মিরপুর–১ এলাকার পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁদের অভিযোগ, স্ট্যান্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে এবং চাঁদা দিতে মালিকদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। মাসে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। বিপ্লব, সোলেমান দেওয়ান, ফারুক হোসেন, মহব্বত আলী, মাভেল ভূঁইয়া, তৈয়ব আলী, আলমগীর হোসেন, কানা পলাশ, রাসেল, শামীম, মজিবর রহমানসহ ৬০ থেকে ৭০ জন এই কাজের সঙ্গে জড়িত।
নিজেকে বৃহত্তর মিরপুর লেগুনা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সাবেক ও বহিষ্কৃত নেতা। তাঁদের মধ্যে সোলেমান দেওয়ান শাহ আলী থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, মহব্বত আলী দারুস সালাম থানা শ্রমিক দলের বর্তমান সদস্যসচিব এবং মাভেল ভূঁইয়া শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি ও স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন।
সাইদুর রহমানের অভিযোগ, লেগুনা স্ট্যান্ডের পাশাপাশি মিরপুর-১-এর কাঁচাবাজার, ফুটপাত, ভ্যানগাড়ি রাখার জায়গা এবং বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবসা থেকেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
সাইদুর রহমান আরও বলেন, ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাঁচটি লেগুনা স্ট্যান্ডে অবস্থান করে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁরা আক্রমণ করেন। এ কারণে সাধারণ মালিকেরা সেখানে যেতে পারছে না। তারা সরকার ও প্রশাসনের সহায়তা চান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোলেমান দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, মারধরের ঘটনায় তিনি জড়িত নন। রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় বিতর্কিত হয়ে একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করছে। তিনি কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
এ বিষয়ে এস এ সিদ্দিক সাজু প্রথম আলোকে বলেন, লেগুনাশ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মারামারি সম্পর্কে তিনি শুনেছেন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তাঁরা কেউ সম্পৃক্ত নন বলেও জেনেছেন। তিনি যেহেতু রাজনীতি করেন, তাঁর অনুসারী থাকতেই পারে। তবে কেউ লেগুনা ব্যবসা বা ওই ঘটনায় জড়িত নন।