নব্য জেএমবি সদস্যদের ব্যাগে বোমা, যোগাযোগে ‘পিটি’ ও টাকা লেনদেনে বিশেষ অ্যাপ

চারতলা একটি বাড়ি ঘিরে রেখে অভিযান চালাচ্ছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

সাভারে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও টাকা লেনদেনে সাধারণত অপ্রচলিত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করেন।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার এক সদস্যের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের চলাফেরা, বোমা বহন ও হামলার কৌশল সম্পর্কেও নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

যোগাযোগে ‘প্রটেকটেড টেক্সট’, টাকা লেনদেনে ‘ইলিমেন্ট’

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে নব্য জেএমবির সদস্যদের যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রটি বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ‘প্রটেকটেড টেক্সট’ বা পিটি নামে একটি ওয়েবসাইট এবং টাকা লেনদেনের জন্য ‘ইলিমেন্ট’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করতেন

পিঠের ব্যাগে বোমা, অস্ত্র

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি সূত্র বলছে, গ্রেপ্তার আরিফসহ সাম্প্রতিক এমন ঘটনাগুলোয় যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের চলাফেরার ধরনেও মিল পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা সাধারণত পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করেন। ওই ব্যাগে বোমা, অস্ত্র, ছুরি ও চাপাতি রাখা হয়। সূত্রটি বলছে, কোথাও তল্লাশির মুখে পড়লে এসব অস্ত্র বা বোমা দিয়ে তাৎক্ষণিক হামলা চালিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরিফের কাছে থাকা একটি ব্যাগ থেকে পাঁচটি বোমা ও ছুরিসদৃশ তিনটি বোমা পাওয়া গেছে। পাঁচটিই জিআই পাইপের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর কাছ থেকে বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
ঢাকার সাভারে একটি মসজিদের খোলা মাঠে পাওয়া কালো স্কচটেপে প্যাঁচানো প্রেশার কুকার
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

আরিফের তথ্যেই বাড়িতে অভিযান

গ্রেপ্তারের পর আরিফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি পাইপবোমাসহ (আইইডি) বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাভার থানায় আরিফসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করে পুলিশ।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ওই বাড়ি থেকে পাইপবোমার পাশাপাশি নানা ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এর কিছু বিস্ফোরক পুলিশের কাছে নতুন মনে হয়েছে। সেগুলোর ধরন ও উপাদান শনাক্ত করতে রাসায়নিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।

পরদিন মিলল ‘প্রেশার কুকার’ বোমা

আরিফকে গ্রেপ্তারের পরদিন বুধবার সাভারের সাধাপুর এলাকায় একটি মসজিদের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামে স্কচটেপে মোড়ানো একটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা থেকে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে।

পরপর দুই দিনে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সাভার থানায় মামলা করে পুলিশ।

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ছয় দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। তবে মামলাটি অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসামিসহ মামলার নথিও ওই ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

কয়েকটি ঘটনায় একই ধরনের বিস্ফোরক

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বোমাগুলোয়ও মিল পাওয়া যাচ্ছে। মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং আশুলিয়ার একটি মুদিদোকান থেকে উদ্ধার করা প্রেশার কুকার বোমা তৈরিতে একই ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্য, বিয়ারিং বল ও সার্কিট সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব বোমায় ট্রাই–অ্যাসিটোন ট্রাইপার–অক্সাইড (টিএটিপি) নামে বিস্ফোরকদ্রব্য ব্যবহার করা হয়েছে। তাপ, ঘর্ষণ, আঘাত বা নড়াচড়ায় এটি বিস্ফোরিত হতে পারে।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে একতলা ভবনের পশ্চিম পাশের দুটি কক্ষের দেয়াল উড়ে গেছে। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

একাধিক ঘটনায় একই ধরনের উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের ধারণা, এসব ঘটনার মধ্যে সাংগঠনিক যোগসূত্র থাকতে পারে।

এদিকে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই ঘটনায় রাকিব নামের যুবক এক পুলিশ সদস্যকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন

১১ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১০টি ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোয় নব্য জেএমবির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে বলে সিটিটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিটি ঘটনায় একই পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা হলেন মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুন, শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফ, রাকিব ও বাপ্পী।

তদন্তকারীরা বলছেন, তাঁদের মধ্যে পলাতক মামুন নব্য জেএমবির এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাপ্পীও পলাতক, তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন