বেকারত্ব যেন এক মরণযন্ত্রণা

দুর্নীতির কালো থাবায় বিপন্ন বাংলাদেশ। সর্বনাশা এই মরণছোবলে সমাজ জর্জরিত। প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা সর্বত্রই যেন দুর্নীতি। শিক্ষিত তরুণ সমাজকে বলা হয় দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু দুর্নীতির করাল গ্রাসে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। ফলে হু হু করে বাড়ছে বেকারত্বের হার।

কোনো কর্মক্ষম মানুষ যখন পেশা হিসেবে কাজ খুঁজে পান না, তখন যে পরিস্থিতি হয়, তাকে বলা হয় বেকারত্ব। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অভিশাপ হচ্ছে বেকারত্ব। দিন দিন বেড়েই চলেছে বেকারত্বের হার। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

বাংলাদেশের বেকার যুবসমাজের অর্ধেকের বেশি শিক্ষিত বেকার। আর এ শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো, সব জায়গায় চরম দুর্নীতি। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দাসহ বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্বের মাত্রা যেন চরমে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বেকারত্বের হার বেশি। এখানে বেকারত্বের পরিস্থিতির বিশেষ কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ২৫ লাখ ৯০ হাজার বেকার আছেন। ২০২৩ সাল শেষে গড় বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৭০ হাজার। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এখন দেশে বেকারের সংখ্যা বেশি। ২০২৩ সালের গড় বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

এদিকে পুরুষ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত মার্চ মাস শেষে পুরুষ বেকারের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ১০ হাজার। অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ হাজার নারী বেকার কমেছে। এখন নারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৫০ হাজার।

মা–বাবা ছেলে বা মেয়েটির পথ চেয়ে বসে থাকে, কখন তারা পড়াশোনা শেষ করে পরিবারে সচ্ছলতা আনবে, তাঁদের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত হয়েও তাঁদের সন্তানেরা পাচ্ছেন না কোনো কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে বসে বসে চিন্তা করতে হয়, এখন কী হবে! কোথাও তাঁদের নেই কোনো কাজের সুযোগ।

কোনো শিক্ষার্থী যখন অনার্স–মাস্টার্স শেষ করেও চাকরি পান না, তখন তাঁর মধ্যে বিষণ্নতা বহু গুণ বেড়ে যায়।

কাজের সুযোগ না পেয়ে অনেকেই মাদকসহ নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। হতাশায় জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বেকারত্বের চাদরে মোড়ানো মুখগুলো বাক্‌শক্তিহীন। কোথাও মেলে না মনোবল, চাহনিতে পরিহাস। সবশেষ এ অন্ধকারে মা একমাত্র আশ্বাস।’

বেকারের নীরব যন্ত্রণা কেউ অনুভব করতে পারে না, কেউ বুঝতে চায় না তাঁদের অনুভূতি।

আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সেশনজট, জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা ও সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে দিন দিন বেকারত্বের সৃষ্টি হচ্ছে। ইউনেসকোর এক গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষা হলো দারিদ্র্য বিমোচনের প্রধান শর্ত। কিন্তু আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা, তা শিক্ষিত জাতির কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পূরণ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে কি?

একজন স্নাতক বা স্নাতকোত্তরধারী শিক্ষিত তরুণ পড়ালেখা শেষে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশে কাজ না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে দেশ মেধাশূন্য হচ্ছে।

২১-২২ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী ৫৭টি দেশে গমন করেন। ২০২২ সালে ১১ হাজার শিক্ষার্থী শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু কেন? ইউনেসকোর তথ্য বলছে, ৭০ থেকে ৯০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী প্রতিবছর উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে পাড়ি জমান।

প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন মেধাবীরা। ফলে নীরবে ‘মেধা পাচার’ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে? কারণ, দেশে চাকরির অনিশ্চয়তা, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির আধিপত্য, বিদ্যাপীঠে অনুকূল পরিবেশ না থাকা, লেখাপড়ার বৈশ্বিক মানের ঘাটতি। বাংলাদেশে লেখাপড়া করেও বেকার থাকতে হয়। এখানে চাকরির নিশ্চয়তা নেই।

আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ হলেও মিলছে না কাজ। অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় দেখা যায়, বিদেশে উঁচু বেতন দিয়ে দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমরা যোগ্য লোকবল তৈরি করতে অপারগ। শিক্ষিত তরুণদের মেধা ও শ্রমশক্তি যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। এতে বেকারত্বের বোঝা লাঘব হবে।

বেকারত্ব জাতি, পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অভিশাপ। তাই দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে গবেষণালব্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বেকারত্বের ভয়াবহতা দূরীকরণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে। তাই স্বনির্ভর উন্নয়ন কৌশল অবলম্বন, সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে অজ্ঞতা দূর করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও উচ্চশিক্ষায় বাস্তবমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং কার্যকর জনশক্তি তৈরি করে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। দেশে বিশেষ ধরনের মৌসুমি কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের দেশের কুটিরশিল্প পুনরুদ্ধার করতে হবে।

জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে এবং বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত বেকার তরুণ ও তরুণীদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আমাদের তরুণ সমাজকে রক্ষা করার জন্য চাই মাঠপর্যায় থেকেই উদ্যোগ। এ ছাড়া দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা। তাহলে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

সাকিবুল হাছান

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা কলেজ, ঢাকা

Sakibulhasanlearning@gmail.com