‘যাওয়ার সময় আমি না করেছিলাম নাতিটাকে নিতে’, অশীতিপর দাদার আহাজারি

ছেলে, ছেলের বউ ও নাতির মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান অশীতিপর আবদুল করিম মাস্টার। শনিবার ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চর আশাবট গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয় মারা গেছেন। এমন খবরে ওই আত্মীয়বাড়িতে রওনা হন নুরুজ্জামান বাবলু। সঙ্গে স্ত্রী আর সাত বছরের ছেলে সাদমানকে নেন। বাড়িতে আরও দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে রেখে যান। রওনা হওয়ার সময় নুরুজ্জামানের অশীতিপর বাবা আবদুল করিম মাস্টার (৮৭) বলেছিলেন, ‘নাতিটাকে (সাদমান) নেওয়ার দরকার নেই। বাড়িতে রেখে যা।’ কিন্তু নুরুজ্জামান বলেন, ‘ছেলেটা খুব দুষ্টু। রেখে গেলে সামলাতে তোমার কষ্ট হবে।’

এ কথা বলে বারবার আফসোস করছিলেন আবদুল করিম মাস্টার। জানাজায় শরিক হতে গিয়ে ফিরে আসেননি তাঁর ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি। পথে বাসচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার মোট সাতজন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। ওই সাতজনের মধ্যে তিনজন নুরুজ্জামান বাবলু (৫০), তাঁর স্ত্রী শীলা আক্তার (৪০), আর তাঁদের শিশুসন্তান সাদমান (৭)। তাঁদের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চর আশাবট গ্রামে।

দুর্ঘটনাকবলিত অটোরিকশা ঘিরে স্থানীয়দের ভিড়। শুক্রবার সদর উপজেলার আলালপুরে ময়মনসিংহ–শেরপুর সড়কে

গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে ময়মনসিংহ-শেরপুর মহাসড়কে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আলালপুর বড়বিলা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে চর আশাবট গ্রামে নুরুজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি সুনসান নীরব। বাড়ির সামনে কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গতকাল যাঁরা আসতে পারেনি, আজ তাঁরা আসছেন সহমর্মিতা জানাতে। দেখা যায়, বাড়ির সামনে অসহায়ের মতো পায়চারি করছেন অশীতিপর আবদুল করিম মাস্টার। তিনি বলেন, ‘যাওয়ার সময় আমি না করেছিলাম নাতিটাকে নিতে...।’ কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসছিল তাঁর। ওই সময় আবদুল করিমের মেয়ে নুরজাহান এসে বাবাকে বলতে থাকেন, ‘চলো, তোমাকে গোসল করিয়ে দিই।’ বলতে বলতে ভাই, ভাবি আর ভাতিজার শোকে নুরজাহানও কাঁদতে শুরু করেন।

নুরজাহান বলেন, তাঁর ভাই নুরুজ্জামান বাবলুর চার সন্তান। সাদমান সবার ছোট। বড় মেয়ে নুসফাত জাহান (১৬) দশম শ্রেণি, ছোট মেয়ে নুসাইবা জাহান (১৪) অষ্টম শ্রেণি আর বড় ছেলে আবু সিনহা (১২) মাদ্রাসায় পড়ে। বাবা, মা আর ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে এ তিনজন নাওয়া–খাওয়া বন্ধ করে সারাক্ষণ শুধু কেঁদেই চলেছে। নুরজাহান বলেন, ‘কীভাবে এদের সামলাব। কী সান্ত্বনা দিব ওদের।’

নুরুজ্জামানের চাচাতো ভাই নাঈমুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন স্বজন জানান, নুরুজ্জামান তাঁর চার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য ফুলপুর উপজেলা সদরে বসবাস করতেন। শুক্রবার স্কুল বন্ধ থাকায় বৃহস্পতিবার বাড়িতে আসেন। নুরুজ্জামান দুইবার সৌদি আরবে গিয়ে দেশে ফেরত এসেছেন। তাতে তাঁর অনেক টাকা ক্ষতি হয়। বর্তমানে তিনি বেকার ছিলেন। এসব নিয়ে তাঁর মধ্যে কিছুটা হতাশা ছিল।

জালাল উদ্দিন নামের একজন স্বজন বলেন, তিনজনের মৃত্যুর খবর পেয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার করে টাকা দেওয়ার কথা। স্থানীয় ইউপি সদস্য এ খবর জানিয়ে গেলেও আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত টাকা পাওয়া যায়নি। এর সঙ্গে আরও কিছু আর্থিক সহযোগিতা হলে পরিবারটির জন্য উপকার হবে।